বিশ্লেষণ · কৃষি · শিল্পনীতি

বাংলাদেশে সস্তায় অ্যামোনিয়া উৎপাদন

বর্তমান বাস্তবতা, বড় চ্যালেঞ্জ, আর ভবিষ্যতের পথ

মার্চ ২০২৬

টাইগার ট্রেডিং - leading ammonia supplier in bangladesh - এর একটি গবেষণা নথি।

বাংলাদেশের কোনো এক কৃষক ভোরবেলা ধানক্ষেতে ইউরিয়া সার ছিটাচ্ছেন। ওই সাদা দানার পেছনে আছে একটা লম্বা শিল্পচক্র। ইউরিয়ার মূল কাঁচামাল হলো অ্যামোনিয়া, আর অ্যামোনিয়া তৈরি হয় প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে। সমস্যাটা এখানেই - দেশের গ্যাস ফুরিয়ে আসছে, কারখানাগুলো পুরোনো, আর আমদানি করা ইউরিয়ার দাম বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডারে চাপ দিচ্ছে।

তাহলে কি বাংলাদেশ কখনো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সস্তায় অ্যামোনিয়া বানাতে পারবে? উত্তরটা সহজ না, কিন্তু আশাহীনও না।

সমস্যাটা আসলে কতটা গভীর?

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৩২ লাখ টন ইউরিয়া সার লাগে। এই সার না দিলে ধান, গম, সবজি কোনোটাই ঠিকমতো হয় না। সমস্যা হলো, আমাদের নিজেদের কারখানাগুলো এই চাহিদার পুরোটা মেটাতে পারছে না।

মূল কারণ গ্যাসের ঘাটতি। সাতটি ইউরিয়া কারখানার কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ১৮ থেকে ১৯ লাখ টন হলেও বাস্তবে গ্যাস-সংকটে বহু সময় অধিকাংশ কারখানা বন্ধ থাকে। ফলে সরকারকে বেশি দামে বিদেশ থেকে ইউরিয়া কিনতে হয়।

বিসিআইসির হিসাবে দেশে উৎপাদিত ইউরিয়ার খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ৪৬ টাকা, আর আমদানি করলে লাগে প্রায় ৬১ টাকা। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহ ঠিক থাকলে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব। এই ফারাক শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ, বাজেট এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

পুরোনো কারখানার গল্প

আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি বা যমুনা ফার্টিলাইজারের মতো কারখানাগুলো তৈরি হয়েছিল যখন বাংলাদেশের গ্যাসের গুণমান ছিল ভিন্ন। সময়ের সাথে গ্যাসের কম্পোজিশন বদলে গেছে, ফলে এক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনে এখন ডিজাইনের চেয়ে বেশি গ্যাস লাগে। এর সাথে পুরোনো যন্ত্রপাতি, তাপ অপচয় এবং লিকেজ যোগ হলে খরচ আরও বাড়ে।

এই কারখানাগুলো বন্ধ করা যায় না, কারণ বিকল্প পুরোপুরি তৈরি হয়নি। কিন্তু এভাবে চালিয়ে যাওয়াও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

গোরাশাল-পালাশ: আশার আলো

এই পটভূমিতে গোরাশাল-পালাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি দেশের সবচেয়ে আলোচিত শিল্প প্রকল্পগুলোর একটি। প্রতিদিন প্রায় ১৬০০ টন অ্যামোনিয়া এবং ২৮০০ টন দানাদার ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এটি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে।

এখানে তাপ পুনরুদ্ধার, কার্বন ডাই-অক্সাইড ক্যাপচার এবং গ্যাস-দক্ষ প্রক্রিয়া ব্যবহারের ফলে একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে পুরোনো কারখানার তুলনায় বেশি ইউরিয়া উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়।

সস্তায় অ্যামোনিয়া পেতে হলে কী করতে হবে?

  • গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে: খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে সার কারখানার জন্য ন্যূনতম গ্যাস বরাদ্দ নীতিগতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
  • পুরোনো কারখানা আপগ্রেড করতে হবে: টারবাইন আপগ্রেড, তাপ অপচয় কমানো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে একই গ্যাসে বেশি উৎপাদন সম্ভব।
  • গ্যাস ট্যারিফে ভারসাম্য দরকার: সার কারখানা কিছুটা কম দামে গ্যাস পাবে, কিন্তু বিনিময়ে দক্ষতা ও উৎপাদন টার্গেট নিশ্চিত করবে - এমন নীতি দরকার।

গ্রে, ব্লু, গ্রিন - এই রঙের হিসাবটা কী?

গ্রে অ্যামোনিয়া প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে তৈরি হয় এবং কার্বন সরাসরি বাতাসে যায়। বাংলাদেশ এখন মূলত এই পথে আছে।

ব্লু অ্যামোনিয়া গ্যাস থেকেই তৈরি হয়, কিন্তু কার্বনের বড় অংশ ধরে রাখা হয়। খরচ বেশি হলেও নির্গমন কম।

গ্রিন অ্যামোনিয়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করে, তারপর নাইট্রোজেনের সাথে মিলিয়ে তৈরি হয়। এটি কার্বন-শূন্য হলেও এখনো সবচেয়ে ব্যয়বহুল।

বাংলাদেশের জন্য রোডম্যাপ

এখনই গ্রে অ্যামোনিয়াকে সবচেয়ে দক্ষ করতে হবে। নতুন প্ল্যান্টে ভবিষ্যতের ব্লু অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরের সুযোগ রাখতে হবে। আর সৌরশক্তি সস্তা হলে গ্রিন অ্যামোনিয়ার পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে।

গোরাশাল-পালাশ প্রকল্পে কার্বন ডাই-অক্সাইড রিকভারি ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ব্লু অ্যামোনিয়ার দিকে যাওয়ার একটা বাস্তব অপশন তৈরি করে।

গ্রিন অ্যামোনিয়া দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হতে পারে, কিন্তু এখনই সেটাই মূল সমাধান নয়। কারণ ইলেক্ট্রোলাইজারের দাম বেশি এবং দেশে সস্তা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ এখনও সীমিত।

খাদ্যনিরাপত্তা, রিজার্ভ, আর ভবিষ্যৎ

সস্তায় অ্যামোনিয়া উৎপাদনের বিষয়টাকে অনেকে টেকনিক্যাল ইস্যু মনে করেন, কিন্তু এটা আসলে সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন। ইউরিয়া আমদানি বাড়লে ডলার বাইরে যায়, রিজার্ভে চাপ পড়ে এবং সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে এসে লাগে।

বাংলাদেশের মাটিতে এখনো গ্যাস আছে - হয়তো বেশিদিন নয়, কিন্তু এখনো আছে। সেই গ্যাস দিয়ে সর্বোচ্চ দক্ষতায় অ্যামোনিয়া-ইউরিয়া বানানোটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। একই সাথে নতুন প্ল্যান্টে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করতে হবে।

পরিবর্তন রাতারাতি হবে না। কিন্তু সঠিক নীতি, সঠিক বিনিয়োগ আর একটু দূরদর্শিতা থাকলে বাংলাদেশ নিজেই নিজের সার বানাতে পারবে - সস্তায়, দক্ষতায়, এবং ভবিষ্যতের পথ খোলা রেখে।

এই লেখাটি বিসিআইসি বার্ষিক প্রতিবেদন, GPUFF প্রকল্প দলিল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক টেকনো-ইকোনমিক গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি।